আজ আপনাদের একটি গল্প শোনাব—
"হিংস্র, উগ্রবাদী, চরম নারীবিদ্বেষী এবং নারী অধিকার হরণকারী জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবানের উত্থানের গল্প।"
আসলে কেন জন্ম হয়েছিল তালেবানের?
তখন নব্বইয়ের দশক। আফগানিস্তান সবেমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) থেকে মুক্ত হয়েছে। সোভিয়েত সমর্থিত নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর আফগানিস্তানে প্রায় চার বছর চরম অরাজকতা চলে। চারিদিকে চোরের উপদ্রব, লুটপাট আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে চাঁদা আদায়, গুম ও খুন ছিল নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা। মানুষের কাছে সবচাইতে অসহনীয় যে বিষয়টি ছিল, তা হলো এই চাঁদাবাজি। যার কাছেই অস্ত্র, সে-ই চাঁদা দাবি করত। এভাবে প্রতিনিয়ত চাঁদা দিতে দিতে সাধারণ মানুষ একসময় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল।
এমনই এক চাঁদাবাজ ছিল 'সালেহ' এবং তার দল। এমন কোনো অপকর্ম ছিল না যা সে করত না—মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা থেকে শুরু করে সুন্দরী নারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা, সবই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।
এরই মধ্যে একবার কান্দাহার থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় দু’জন নারীকে তুলে নিয়ে যায় সালেহ ও তার বাহিনী। এরপর তাদের ওপর অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন (গণধর্ষণ) চালানো হয়। নরপশুরা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি, অসহায় মেয়ে দুটিকে পিটিয়ে মেরেই ফেলল। মেয়ে দুটির দরিদ্র বাবা অসহায়ভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার উপক্রম করেন। কান্দাহারের দরিদ্র গ্রামবাসীরা এই নির্মম ঘটনাটি অসহায় চোখে দেখলেও ভয়ে কিছু করতে পারেনি।
এরপর কান্দাহারে ৫ জন যুদ্ধবাজ নেতার মধ্যে শুরু হয় এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। টানা পাঁচ দিন যুদ্ধের পর ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ শুক্রবার, সাধারণ মানুষ জুমার নামাজ আদায়ের পর এই অসহনীয় পরিস্থিতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করে। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ‘বাডু’ নামের এক সাবেক মুজাহিদ নির্বিচারে ট্যাংক থেকে মিছিলে গোলাবারুদ নিক্ষেপ করে। এতে ওই মিছিলে থাকা অনেক কান্দাহারবাসী নিহত হন।
এদিকে, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করে মুজাহিদ মোল্লা আব্দুস সালাম জায়েদ কান্দাহারে নিজের গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। সেখানে তিনি একটি মসজিদের ইমামতি করতেন এবং ছোট একটি মাদ্রাসা চালাতেন। গ্রামের অসহায় মানুষের এমন চরম দুর্দশা দেখে তিনি নির্ঘুম রাত কাটাতেন আর ভাবতেন কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অসহায়ভাবে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতেন যেন এই আজাব থেকে মুক্তির কোনো পথ বের হয়। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল তাঁরই এক সাবেক যুদ্ধকালীন সহযোগী মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের কথা। মোল্লা ওমর ছিলেন সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের একজন বীর মুজাহিদ। আব্দুস সালাম আর দেরি না করে সরাসরি চলে গেলেন মোল্লা ওমরের কাছে।
আব্দুস সালাম তাঁকে গিয়ে বললেন, “দেখো ভাই ওমর, কান্দাহারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মানুষকে উদ্ধার করার জন্য কিছু একটা করা প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস, একমাত্র তুমিই পারো এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে।”
মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের স্ত্রী তখন সবেমাত্র একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। মোল্লা ওমর বললেন, “আমার স্ত্রীর সবেমাত্র সন্তান হয়েছে, এই মুহূর্তে ঘর ছেড়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া আমার জন্য কঠিন। তবে আপনারা যদি আমাকে ওয়াদা দেন যে কখনো আমাকে বিপদে ফেলে চলে যাবেন না, তবেই আমি আপনাদের সাথে যেতে পারি।” সকলে মোল্লা ওমরকে ওয়াদা করলেন। এরপর সবাই মিলে গেলেন একটি মাটির তৈরি মসজিদে। সেখানে আব্দুস সালামের কয়েকজন ছাত্র এবং গ্রামবাসীদের নিয়ে গঠিত হলো একটি নতুন সংগঠন।
তাদের কাছে ভারী কোনো অস্ত্র ছিল না; ছিল কেবল সোভিয়েত আমলের পুরনো কয়েকটি সাধারণ রাইফেল আর একটি জরাজীর্ণ মোটরসাইকেল। আব্দুস সালাম তাঁর জীবনের সমস্ত সঞ্চয়—মাত্র "দশ হাজার আফগানি মুদ্রা" সংগঠনের তহবিলে দান করলেন।
এরপর মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে শুরু হয় তাঁদের অভিযান। দখলদারদের প্রতিটি চেকপোস্টে তাঁরা অতর্কিত আক্রমণ চালাতে থাকেন। দস্যুরা তাঁদের প্রতিরোধ করতে না পেরে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে তালেবানরা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে থাকে। ধীরে ধীরে গ্রামবাসীদের মনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করে।
এরপর তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল কুখ্যাত সালেহের চেকপোস্ট। তালেবানদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে সালেহকে একাকী ফেলে তার দলবল পালিয়ে যায়। সালেহের আস্তানা থেকে তাঁরা প্রচুর অর্থ ও অস্ত্র উদ্ধার করেন।
"মোল্লা মোহাম্মদ ওমর কান্দাহার শহরের ঠিক মাঝখানে সালেহের মুখে টাকা গুঁজে দিয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। অবশেষে বিচার পান সেই নির্মমভাবে নিহত মেয়ে দুটির দরিদ্র ও হতভাগা বাবা।" এই ঘটনার পর মোল্লা ওমর ও তাঁর দলের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। দলে দলে সাধারণ মানুষ এসে এই সংগঠনে যোগ দিতে শুরু করে। এভাবেই জন্ম হয় ‘তালেবান’ গোষ্ঠীর। (উল্লেখ্য, 'তালেবান' শব্দটি পশতু শব্দ 'তালিব' থেকে এসেছে, যাঁর অর্থ—ছাত্র)।
পরবর্তীতে তারা সমস্ত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে এবং তাদের নিজস্ব ভাবধারায় এক কঠোর শাসনব্যবস্থা কায়েম করে।
[যারা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, তাদের জন্য এই পোস্টটি। কারণ ইতিহাস তো আর মুছে ফেলা যায় না...]
